Thursday, April 18International Online Tv Portal
Shadow

কিংবদন্তি সিবি জামান’কে নিয়ে স্মৃতিচারণ

অনলাইন ডেস্ক :

১৯৪১ সাল, তৎকালীন উপমহাদেশের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না। ব্রিটিশদের প্রতি অসন্তোষ তো রয়েছেই, তার সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার কারণে যেকোন সময় জাপানীদের বম্বিং এর আশঙ্কা দন্ডায়মান! ঠিক এমনই একটা সময়ে আসাম গৌরীপুরের তৎকালীন পোস্টমাস্টার ইমদাদুর রহমান চৌধুরী নিজের গর্ভবতী স্ত্রী শরীফা খাতুন চৌধুরীকে নিয়ে গৌরীপুরের তৎকালীন মহারাজা ও তাঁর পরম বন্ধু প্রভাত কুমার বড়ুয়া (ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক চলচ্চিত্রের জনক প্রমথেশ বড়ুয়া’র বাবা) এর নিমন্ত্রণে গৌরীপুরের রাজপ্রাসাদে অবস্থান করছিলেন। এই রাজপ্রাসাদের অন্দর মহলেই আগস্ট মাসের ১৪ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন ইমদাদুর রহমান চৌধুরীর ২য় সন্তান চৌধুরী বদরুজ্জামান, যিনি বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তী সি. বি. জামান নামে সুপরিচিত। কিংবদন্তি সিবি জামানের একমাত্র পুত্র সিএফ জামানও বর্তমান মিডিয়া কাজে জড়িত।

১৯৬২ সালে জহির রায়হানের “সোনার কাজল” চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে হাতেখড়ি নিলেও নিজের অফিশিয়াল ক্যারিয়ারের শুরু করেন ১৯৬৬ সালে লাহোর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে। ১৯৭২ সাল হতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সরাসরি চলচ্চিত্র পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ সময়ে তিনি নির্মাণ করেন একে একে ঝড়ের পাখি, উজান-ভাটি, পুরস্কার, শুভরাত্রি, হাসি, লাল গোলাপ ও কুসুম-কলি’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র। এর মধ্যে ব্যবসায়ীক সফলতার পাশাপাশি পুরস্কার ১৯৮৪ সালে ৫টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও শুভরাত্রি বাচসাস পুরস্কারে ভূষিত হয়। জাতীয় পুরস্কার পাবার পাশাপাশি পুরস্কার চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ‘গোয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’, ‘দিল্লী ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল’ ও রাশিয়ার ‘তাশখান্দ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে’ প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়। শুধু তাই না, সেইসাথে প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে জাপানের ‘এনএইচ কে টিভি’ পুরস্কারের কপিরাইট কিনে নিয়ে যায় এবং নিজেদের দেশে তা প্রদর্শিত করে। এছাড়াও তৎকালীন সময়ে তাঁর সহকারীদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন পরবর্তীতে টেলিভিশন ও ফিল্মে সফলতার সাথে নিজেদের নাম উজ্জ্বল করেন যার মধ্যে হানিফ আকন দুলাল, সালাহ্‌উদ্দীন লাভলু, শিল্পী চক্রবর্তী ও জাকির হোসেন রাজু অন্যতম। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি স্বল্প-দৈর্ঘ্য ও প্রামান্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যার মধ্যে ডিএফপি’র ‘নুরুর সমস্যা’ প্রামান্যচিত্রটিতে প্রথমবারের মতো তিনি ক্যামেরার সামনে আনেন আজিজুল হাকিম ও সালাহ্‌উদ্দীন লাভলু’র মতো অভিনেতাদের।

মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলো বাদেও তিনি ‘রাজা বাদশা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু শ্যুটিং শেষ হওয়া সত্ত্বেও প্রযোজকদের জটিলতার কারণে তা কখনো আলোর মুখ দেখেনি।

ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি হাতে গোণা কয়েকজন মানুষের অন্যতম যাদের অজাতশত্রু বলে ডাকা হয়। কাজ করেছেন অনেকের সাথেই কিন্তু তাঁদের মধ্যে খান আতাউর রহমান ছিলেন এমন একজন মানুষ যাকে তিনি নিজের গুরু ও সবচাইতে কাছের বন্ধু হিসেবে ভাবতেন। “সাত ভাই চম্পা”‘ থেকে শুরু করে ‘এখনো অনেক রাত’ পর্যন্ত খান আতা’র সব ছবিতেই তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। শুধু তাই না, তিনি, খান আতাউর রহমান ও তাহের চৌধুরী মিলে গড়ে তোলেন ‘প্রমোদকার’ চলচ্চিত্র গোষ্ঠী। এই প্রমোদকার নামেই তাঁরা একত্রে পরিচালনা করেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ৪ চলচ্চিত্র, ‘ত্রিরত্ন’, ‘সুজন-সখী’, ‘দিন যায় কথা থাকে’ ও ‘হিসাব-নিকাশ’।

১৯৯০ সাল হতে পারিবারিক ও ব্যবসায়ীক ব্যস্ততার দরুন পরিচালনার ইতি টানলেও ফিল্মের নেশা তাঁকে ছাড়তে পারেনি। তাইতো এফডিসির কোন অনুষ্ঠান তিনি মিস করেন না। প্রায় ৩০ বছর পরে আবার একটি নতুন চলচ্চিত্রের কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শারীরিক অবনতি ঘটায় সেই ছবি পরবর্তীতে তিনি ছেড়ে দিতে বাধ্য হোন, এই মাস খানেক আগেই হার্ট এ্যাটাকের ধাক্কা সামলে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেননি। তবে সেই অসমাপ্ত ছবির কাজ সমাপ্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছেন তার একমাত্র পুত্র সিএফ জামান। সব ঠিকঠাক থাকলে সেই ছবি দিয়েই বড় পর্দায় পরিচালক হিসেবে সিএফ জামানের অভিষেক হতে পারে, বাকি সব বিস্তারিত জানতে নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সিনেমাপ্রেমীদের।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১৪ই আগস্টে সিবি জামান ৮৩ বছরে পা রেখেছেন। তার জন্মদিন উপলক্ষে তার সন্তানের স্মৃতিচারণ থেকে লেখাটি গৃহীত হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *